শ্রমশক্তি রপ্তানি: ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী

বাংলাদেশে চাকরি নেই। কাজ নেই। আয়-রোজগারের নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু আশার অভাব আছে কি? মোটেই না। বেকার তরুণের হাতে যখন দেশের চাকরির বাজারের দরজা বন্ধ, তখন তিনি তাকান বিদেশের দিকে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। এত দিন সেটিই ছিল বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে পরিচিত ঠিকানা। মরুভূমির দেশে গিয়ে ঘাম ঝরিয়ে টাকা পাঠাবেন, সেই টাকায় দেশে সংসার চলবে, বাড়ি হবে, ভাই-বোনের পড়াশোনা হবে, কেউ দোকান দেবেন, কেউ জমি কিনবেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের বেকারত্বের একটা বড় অংশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের এক ধরনের অলিখিত চুক্তি ছিল।

সমস্যা হলো, সেই চুক্তিটিও এখন আর আগের মতো কার্যকর নেই। বিদেশে কর্মী পাঠানোর বাংলাদেশের গল্পটি দীর্ঘদিনের। ১৯৭৬ সালে বিদেশে কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে গেছেন। ২০২৩ সালে তো ১৩ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে গেছেন, যা ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ। মনে হতে পারে, বাংলাদেশের কর্মসংস্থান নীতির সবচেয়ে সফল মন্ত্রণালয়ের নাম বুঝি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। দেশে কাজ দিতে না পারলেও বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে অন্তত আমরা বিশ্বমানের!

কিন্তু এখানেই অনেক ‘যদি’ ‘কিন্তু’ আছে। এত মানুষ বিদেশে গেলেও আমাদের শ্রমবাজার আসলে কতটা বৈচিত্র্যময়? ২০১১ থেকে ২০২৫, এই ১৫ বছরে ২০৩টি দেশে কর্মী পাঠানো হলেও প্রায় ৭৯ শতাংশ গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। আর ৯৪ শতাংশ গেছেন ১০টি দেশে। অর্থাৎ পৃথিবীর মানচিত্রে আমাদের শ্রমবাজার বিশাল, কিন্তু বাস্তবে সেটি ১০টি দেশের দরজায় গিয়ে থেমে আছে। একে বৈচিত্র্য বলা যায় না, বরং বলা যায়, ১০টি দরজার ওপর জাতীয় ভবিষ্যৎ ঝুলিয়ে রাখা।

এই ১০ দেশের মধ্যে সাতটিই মধ্যপ্রাচ্যের। সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইনসহ কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রধান ভরসা। কিন্তু এখন একে একে দরজাগুলো ছোট হচ্ছে। কোথাও শ্রমবাজার বন্ধ, কোথাও কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমে গেছে, কোথাও নিয়োগের শর্ত কঠিন হয়েছে। মালয়েশিয়াও অনিয়মের কারণে ২০২৪ সালের জুনে বন্ধ হয়ে গেছে। ওমানের বাজার ২০২৪ সাল থেকে কার্যত বন্ধ। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০২৩ সালে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি গেলেও ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৩ হাজার ৭৫০-এ।

অর্থাৎ যে বাজারকে এত দিন আমরা নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলাম, সেটিই এখন অনিশ্চিত। সৌদি আরব অবশ্য এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা। ২০২৪ সালে সোয়া ছয় লাখের বেশি এবং ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি সেখানে গেছেন। কিন্তু এখানেও মেঘ জমছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গেছেন প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার। তার ওপর অভিযোগ আছে, অনেকেই চুক্তি অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়া ৭০ শতাংশ কর্মী স্বল্পমেয়াদি কাজের জন্য যাচ্ছেন। অর্থাৎ আমরা যেন এমন এক চাকরির বাজারে পৌঁছে গেছি, যেখানে চাকরির মেয়াদও এখন মোবাইলের ডেটা প্যাকের মতো, শেষ হয়ে গেলে আবার রিচার্জ করতে হবে।

এ অবস্থায় সরকার নতুন বাজার খুঁজছে। ভালো কথা। কিন্তু নতুন বাজার খুঁজতে গিয়ে যদি রাশিয়া ও কম্বোডিয়াকে সামনে আনা হয়, তখন প্রশ্ন জাগে, বাজার খোঁজা হচ্ছে, নাকি বিপদ খোঁজা হচ্ছে?

২০২৫ সালে কম্বোডিয়ায় ১২ হাজার ২৬৩ জন বাংলাদেশি যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন। দেশটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অষ্টম অবস্থানে উঠে এসেছে। রাশিয়ায় গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন। রাশিয়া রয়েছে ১৩ নম্বরে। সমস্যা হলো, সেখানে গিয়ে অনেকের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটিকে কর্মসংস্থান বলা কঠিন, দুঃস্বপ্ন বলা বরং সহজ।

বেকার মানুষের স্বপ্ন নিয়ে ব্যবসা করার দিন শেষ হওয়া দরকার। কারণ চাকরি না থাকা দুর্ভাগ্য, কিন্তু চাকরির আশায় সর্বস্ব হারানো তার চেয়েও বড় দুর্ভাগ্য। আর রাষ্ট্র যদি সেই দুর্ভাগ্যের পাহারাদার হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে নতুন শ্রমবাজার যতই খোলা হোক, বাংলাদেশের মানুষের জন্য পৃথিবীটা ক্রমেই ছোট হয়ে আসবে।

এক দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে, লক্ষ্মীপুরের জাহাঙ্গীর আলমকে রাশিয়ায় সেনানিবাসে বাবুর্চির কাজ দেওয়ার কথা বলে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু রান্নাঘরের বদলে তাঁকে পাঠানো হয় ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে। প্রশিক্ষণ ছাড়াই হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় অস্ত্র। ১৬ জনের দলে চারজন মারা যাওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে পালিয়ে দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন। চাকরির বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল বাবুর্চি। বাস্তবে কর্মস্থল যুদ্ধক্ষেত্র। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এ যেন নতুন ধরনের ‘জব ডিসক্রিপশন’।

কম্বোডিয়ার গল্পও কম ভয়াবহ নয়। কলসেন্টারে চাকরির কথা বলে নেওয়া বাংলাদেশিদের দিয়ে অনলাইন প্রতারণা করানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেসব স্ক্যাম সেন্টারে অভিযান হয়েছে। জুনেই ৬৪৬ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। অর্থাৎ নতুন শ্রমবাজারের দরজা খুলেছে ঠিকই, কিন্তু দরজার ওপাশে অফিস নয়, স্ক্যাম সেন্টার!

এরপর আছে ইউরোপের স্বপ্ন। ইতালি যাবেন। উন্নত জীবন হবে। দেশে টাকা পাঠাবেন। সেই স্বপ্নের পথে বাংলাদেশি তরুণেরা পাড়ি দেন লিবিয়ায়। সেখানে প্রতারণা, নির্যাতন, মুক্তিপণ, বন্দিজীবন, তারপর ভূমধ্যসাগর। ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়া ৬৬ হাজার ৩১৬ জনের মধ্যে ১ হাজার ১২৬ জন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এই পথে ইতালি যাওয়া ১৪ হাজার ১৯৪ জনের মধ্যে বাংলাদেশিই ছিলেন সবচেয়ে বেশি, ৩ হাজার ৬৯১ জন।

অর্থাৎ বাংলাদেশের বেকার যুবকের সামনে এখন তিনটি রাস্তা। দেশে থাকুন, যেখানে চাকরি কম। বৈধ পথে বিদেশ যান, যেখানে শ্রমবাজার সংকুচিত। অথবা অবৈধ পথে যান, যেখানে জীবনটাই জামানত।

এই সংকটের আরেকটি বড় কারণ আমাদের শ্রমবাজারের দালালনির্ভর চরিত্র। বাংলাদেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা এখন ২ হাজার ৬৪৬। অথচ আগে তা ৮৫০ থেকে ৯০০-এর মধ্যে ছিল। ভারতে এ সংখ্যা ১৯২, পাকিস্তানে ৪৬৪, নেপালে ৪১৬, শ্রীলঙ্কায় ২৪৮। এজেন্সি যত বেশি, প্রতিযোগিতা তত বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রতারণার বাজারও যেন বেশ প্রতিযোগিতামূলক!

মানব পাচারের বিচারব্যবস্থার চিত্র আরও হতাশাজনক। ২০১৮ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৫৩৬টি মামলায় ১ হাজার ৬৫৭ জনকে আসামি করা হলেও গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ৩৫৩ জন। আর ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মানব পাচার আইনে হওয়া ৪ হাজার ৪২৭টি মামলার ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন। ফলে পাচারকারীদের জন্য বার্তাটি বেশ আশাব্যঞ্জক: মানুষ পাচার করুন, মামলা হলে দেখবেন; বিচার হলে ভাগ্য ভালো থাকলে খালাসও মিলতে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বিদেশে যাওয়া কমছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ৫ লাখ কর্মী ছাড়পত্র নিয়েছেন, যেখানে গত বছর একই সময়ে ছিল প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ বিদেশে যাওয়ার পথও সংকুচিত হচ্ছে। অথচ এই মানুষগুলোর পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশিরা বছরে গড়ে ২ হাজার ৬৪৯ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়েছেন। বিশ্বে রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। যারা এই অর্থ পাঠান, তাঁদের আমরা ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলি। কিন্তু যোদ্ধাদের যুদ্ধটা কোথায়, কীভাবে এবং কতটা নিরাপদে হবে, সে প্রশ্নটি যেন আমাদের নীতিনির্ধারণের টেবিলে যথেষ্ট জায়গা পায় না।

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বিদেশে কর্মী পাঠানো। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা জরুরি। কিন্তু শুধু নতুন দেশের নাম ঘোষণা করলেই নতুন শ্রমবাজার তৈরি হয় না। শ্রমবাজার মানে বৈধ নিয়োগ, যাচাই করা নিয়োগকর্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, চুক্তির বাস্তবায়ন এবং প্রতারণার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।

একজন যুবক ৩০ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে গিয়ে যদি চাকরির বদলে যুদ্ধক্ষেত্র পান, একজন ৩২ লাখ টাকা খরচ করে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখে লিবিয়া থেকে বন্দি হয়ে ফেরেন, তাহলে সেটিকে কর্মসংস্থানের সাফল্য বলা কঠিন। বাড়িতে পরিবার অপেক্ষা করে, আর ফিরে আসা যুবকটি ভাবেন, পাওনাদারদের কী বলবেন।

আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি সত্যিই শ্রমবাজার খুলতে চাই, নাকি শুধু বিদেশ যাওয়ার গল্প শুনিয়ে বেকারত্বের অস্বস্তি সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখতে চাই? কারণ বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের জন্য বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। কিন্তু মানুষকে বিদেশে পাঠানো আর মানুষকে নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া এক কথা নয়। প্রথমটি সংখ্যার সাফল্য হতে পারে, দ্বিতীয়টিই আসল সাফল্য।

নতুন বাজার চাই, অবশ্যই চাই। কিন্তু নতুন বাজারের নামে নতুন কবরের জায়গা যেন খুঁজতে না হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দরজা বন্ধ হলে পৃথিবীর অন্য দরজায় কড়া নাড়তেই হবে। তবে দরজা খোলার আগে অন্তত দেখে নিতে হবে, ওপাশে চাকরি আছে, নাকি বন্দুক; অফিস আছে, নাকি স্ক্যাম সেন্টার; কর্মস্থল আছে, নাকি মরুভূমি পেরিয়ে আরেক প্রতারণার ফাঁদ।

বেকার মানুষের স্বপ্ন নিয়ে ব্যবসা করার দিন শেষ হওয়া দরকার। কারণ চাকরি না থাকা দুর্ভাগ্য, কিন্তু চাকরির আশায় সর্বস্ব হারানো তার চেয়েও বড় দুর্ভাগ্য। আর রাষ্ট্র যদি সেই দুর্ভাগ্যের পাহারাদার হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে নতুন শ্রমবাজার যতই খোলা হোক, বাংলাদেশের মানুষের জন্য পৃথিবীটা ক্রমেই ছোট হয়ে আসবে।

লেখক : জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট।

এইচআর/জেআইএম



from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/dC2TAnR
via IFTTT
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post