দখলদারদের কবলে ডাকাতিয়া, ৭৩৬ অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত

একসময় চাঁদপুরের প্রাণ-প্রকৃতি, নৌযাতায়াত ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ডাকাতিয়া নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। নদীর দুই পাড় দখল করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, বসতঘর, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানাসহ নানা ধরনের অবৈধ স্থাপনা। কোথাও কোথাও নদীর তীর এতটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে যে, স্বাভাবিক পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে নদীর নাব্যতা ও পরিবেশের ওপর। বর্ষা মৌসুমে পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়া এবং বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

নদীর এই সংকট থেকে উত্তরণে এবার উদ্যোগ নিয়েছে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও জেলা নদী রক্ষা কমিটির সিদ্ধান্তের পর পরিচালিত যৌথ জরিপে ডাকাতিয়া নদীর দুই পাড়ে মোট ৭৩৬টি বহুতল ভবনসহ অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর তীর দখলমুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।

চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মোলহেড থেকে গাছতলা ব্রিজ পর্যন্ত নদীর দুই পাড়ে সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর জায়গা দখল করে নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কোথাও পাকা বহুতল ভবন, কোথাও টিনের ঘর, আবার কোথাও দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থাপনা নদীর তীরের স্বাভাবিক আকৃতি পরিবর্তন করছে। ফলে নদীর প্রশস্ততা কমার পাশাপাশি পানির স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একসময় ডাকাতিয়া নদীর দুই পাড়ে ছিল খোলা পরিবেশ। নদীর বুক দিয়ে নিয়মিত চলাচল করত নৌযান। নদীর পানি ও তীর ঘিরে স্থানীয় মানুষের নানা ধরনের কর্মকাণ্ড ছিল। নদীটি ছিল চাঁদপুরের পরিবেশ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নদীর দুই পাড়ে দখলদারিত্ব বাড়তে থাকে। একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের ফলে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে নদীর তীর।

স্থানীয় বাসিন্দা ফারদিন জানান, দীর্ঘদিন ধরে নদীর জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে ডাকাতিয়ার স্বাভাবিক চেহারা বদলে গেছে। নদীর তীর দখলমুক্ত করা না হলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নদীতে প্রবাহিত হতে না পারলে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন

রাতে ২৭ শিক্ষককে ডেকে এসএসসির ফল পুনঃযাচাই, ফল পরিবর্তনের অভিযোগ

পথচারী মেহেদী হাসান জানান, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, উচ্ছেদের পর পুনরায় যাতে কেউ নদীর জায়গা দখল করতে না পারে, সে বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি নদীর তীর সীমানা নির্ধারণ করে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে একদিকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ডাকাতিয়া নদীর অস্তিত্বও রক্ষা করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডাকাতিয়া নদীর দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে যৌথভাবে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং জেলা নদী রক্ষা কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালিত এই জরিপে ৭৩৬টি অবৈধ স্থাপনা শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বহুতল ভবন, বসতঘর, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা।

অভিযোগ রয়েছে, নদীর তীর দখলের কারণে শুধু পানিপ্রবাহই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না, নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তীরবর্তী এলাকায় অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও বিভিন্ন বর্জ্য নদীতে পড়ার কারণে পানির গুণগত মানও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদীকে দখলমুক্ত করার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নদীদূষণ বন্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।

বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুর নৌবন্দরের উপ-পরিচালক মো. কামরুজ্জামান জানান, হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং জেলা নদী রক্ষা কমিটির সিদ্ধান্তের পর যৌথ জরিপের মাধ্যমে ডাকাতিয়া নদীর দুই পাড়ে মোট ৭৩৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে নদীর দুই পাড়ের দখলমুক্ত জায়গা পুনরুদ্ধার করা গেলে স্বাভাবিক হবে পানিপ্রবাহ। একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা রক্ষার পথও সুগম হবে।

তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে অচিরেই ডাকাতিয়া নদীর দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে চিহ্নিত স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডাকাতিয়া নদীকে ঘিরে চাঁদপুরের মানুষের রয়েছে দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও আবেগ। নদীটি শুধু একটি জলধারা নয়, চাঁদপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, নৌবাণিজ্য ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিনের দখল ও অব্যবস্থাপনা থেকে নদীকে রক্ষা করা গেলে ফিরতে পারে তার হারানো সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক প্রবাহ।

এনএইচআর/জেআইএম



from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/Qtuk42v
via IFTTT
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post