ঢাকা ও গাজীপুরের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ টঙ্গী। উত্তরার আব্দুল্লাহপুর সেতু পার হলেই শুরু টঙ্গীর ব্যস্ততা। ময়মনসিংহ রোডের এ অংশটি যেন কখনোই ঘুমায় না। দিন-রাত এখানে লেগেই থাকে মানুষের ছোটাছুটি চলা আর যানবাহনের ব্যস্ততা। দূরপাল্লার বাসসহ বিভিন্ন এলাকার বাস ও যানবাহন এখান থেকে চলাচল করে। সড়কের দুই পাশ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের দোকান। পথচারীদের ভিড়, দোকানের সামনে ক্রেতাদের দাঁড়িয়ে থাকা আর যানবাহনের অবিরাম চলাচল মিলিয়ে এমনিতেই ব্যস্ত এই সড়ক। তবে রোববার এলে যেন এই ব্যস্ততার মাত্রা আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। মানুষের ভিড়ের সঙ্গে যোগ হয় সাপ্তাহিক হাটের আনাগোনা। একদিকে গাড়ির হর্ন, অন্যদিকে মানুষ ও পশুপাখির হাঁকডাক মিলিয়ে টঙ্গীর রাস্তায় তৈরি হয় ব্যস্ততার ভিন্ন চিত্র।
রোববার সকাল থেকেই শুরু হয় ব্যস্ততা। বাজারের একপাশে যেন নেমে আসে অন্য জগৎ। সারি সারি খাঁচা, ঝুড়ি আর বাঁশের খুপড়ি। কোথাও ডানা ঝাপটানোর শব্দ, কোথাও কবুতরের গুঞ্জন। দেশি মুরগিসহ কমবেশি বিভিন্ন জাতের পাখি ও প্রাণীর দেখা মেলে হাটে। তবে হাটের একপাশে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি হাঁসের খাঁচা। সাদা, কালো, ছোপছোপ নানা জাতের হাঁসে ভরে আছে। খাঁচার ভেতর ডানা ঝাপটানো আর একসঙ্গে অসংখ্য হাঁসের ডাকের সঙ্গে মিশে আছে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক ও দরদাম। সব পাখির ভিড়ে হাঁসের সংখ্যাই যেন বেশি চোখে পড়ে। তাই টঙ্গীর সাপ্তাহিক এই হাটকে ‘হাঁসের রাজ্য’ বলাই যেন বেশি মানানসই। এ ছাড়া এখানে বিভিন্ন পাখি ও প্রাণীর বাচ্চার পাশাপাশি দেশি মুরগি ও বিভিন্ন জাতের হাঁসের বাচ্চাও পাওয়া যায়।

হাটে দেখা যায়, এক তরুণ হাঁসের বাচ্চা কিনছেন। কাছে গিয়ে কথা হলে জানা যায়, তার নাম তন্ময়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ঢাকার উত্তরখানে নিজস্ব বাড়ি। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোট একটি ব্যবসাও করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘পড়াশোনার পাশাপাশি নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকেই হাঁস পালনের উদ্যোগ নিয়েছি। টঙ্গীর সাপ্তাহিক পশু-পাখির হাটে এসে ছয়টি হাঁসের বাচ্চা কিনেছি। মূলত মাংস উৎপাদনের জন্য চিনা জাতের হাঁস বেছে নিয়েছি। আপাতত অল্প পরিসরে পালন করে দেখতে চাই। হাঁসগুলো কীভাবে বেড়ে ওঠে, পালন করতে কী ধরনের সুবিধা বা অসুবিধা হয়। সবকিছু মিলিয়ে ফলাফল কেমন আসে।’
তন্ময় বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে পালন করে যদি সবদিক ভালো মনে হয়, তাহলে ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়িয়ে ব্যবসা হিসেবে শুরু করার পরিকল্পনা আছে। তবে আমার উদ্দেশ্য শুধু ব্যবসা করে লাভ করা নয়। সাধারণ মানুষের জন্যও যেন কিছুটা সেবামূলক হয়। তাই ভবিষ্যতে হাঁস বিক্রির ক্ষেত্রে সীমিত লাভ রেখে তাদের কাছে তা বিক্রি করার ইচ্ছা আছে।’

হাটের একপাশে তাকালেই দেখা মেলে সারি সারি হাঁসের খাঁচা নিয়ে বসে আছেন অসংখ্য ব্যবসায়ী। হাঁসের ডাক আর ব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে মুখরিত পুরো এলাকা। বিভিন্ন জাতের হাঁসের ভিন্ন ভিন্ন ডাক মিলেমিশে যেন তৈরি করেছে অন্যরকম কোলাহল। বিশেষ করে মাংস বেশি দেয় এমন হাঁসের সংখ্যাই বেশি। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারাও আসছেন হাঁস কিনতে। সব মিলিয়ে হাঁটজুড়ে হাঁসের ডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর ব্যস্ততায় তৈরি হয়েছে প্রাণবন্ত দৃশ্য। এরই ফাঁকে কথা হয় সেলিম নামের হাঁস ব্যবসায়ীর সঙ্গে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তিনি হাঁসের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। টঙ্গীর এই হাটে গত দুই বছর ধরে নিয়মিত হাঁস বিক্রি করছেন। চারজন মিলে হাঁসের ব্যবসা করেন। শুধু টঙ্গীর হাটেই নয়, ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন হাটেও তারা হাঁস নিয়ে যান। সব মিলিয়ে মাসে ২৪টি হাটে হাঁস বিক্রি করেন।
ক্রেতাদের হাঁস দেখানোর ব্যস্ততার মাঝেই সেলিম বলেন, ‘আমরা গ্রামের বিভিন্ন খামার থেকে হাঁস কিনে আনি। এরপর সেগুলো বিভিন্ন হাটে নিয়ে বিক্রি করি। একেকটি চালানে ৫০০-এর মতো হাঁস নিয়ে আসি। হাঁসের বয়স, আকার ও জাত অনুযায়ী ক্রেতাদের মধ্যে চাহিদা থাকে। তাই হাটের চাহিদা বুঝে হাঁস সংগ্রহ করে বিভিন্ন হাটে বিক্রি করার চেষ্টা করি। বর্তমানে প্রতি জোড়া হাঁস ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা দরে বিক্রি করছি।’

হাঁসের রাজ্যে ঘুরে বেড়ানোর ফাঁকে চোখে পড়ে নানা ধরনের ক্রেতার ব্যস্ততা। কেউ হাঁস কিনছেন নিজেরা খাওয়ার জন্য, কেউবা কিনছেন মেহমানের জন্য। আবার কেউবা বাসার ছাদে কয়েক দিন পালন করে পরে খাওয়ার জন্য। আবার কেউ হোটেলের জন্য হাঁস কিনতে এসেছেন। তবে এর বাইরে এমন ক্রেতার সংখ্যাও কম নয়, যারা হাট থেকে হাঁস কিনে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ফেরি করে বিক্রি করেন। সাধারণ ক্রেতার পাশাপাশি ফেরি করে হাঁস বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিও বেশ চোখে পড়ার মতো। তেমনই একজনকে হাটের প্রতিটি খাঁচার কাছে ঘুরে ঘুরে হাঁস দেখতে দেখা যায়। একেকটি হাঁস ধরে ওজন কেমন হবে, কোনটিতে মাংস বেশি; এসব খুঁটিয়ে দেখার পাশাপাশি বিক্রেতাদের সঙ্গে দরদামেও বেশ কষাকষি করছেন তিনি।
কাছে গিয়ে কথা বলে জানা যায়, তার নাম বাবু। ১০ থেকে ১২ বছর ধরে তিনি ফেরি করে বাড়ি বাড়ি হাঁস বিক্রি করছেন। সেই ব্যবসার জন্যই হাঁস কিনতে এই হাটে এসেছেন। হাট থেকে হাঁস কিনে প্রতিটি হাঁসে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত লাভ রেখে বাসাবাড়িতে ফেরি করে বিক্রি করেন।

হাঁস দেখার ফাঁকে বাবু বলেন, ‘ফেরি করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাঁস বিক্রি করছি। দীর্ঘদিন ধরে এই কাজের সঙ্গে জড়িত থাকায় এলাকার অনেক মানুষ আমাকে চেনেন। নিয়মিত আমার কাছ থেকে হাঁস কেনেন। হাঁস সংগ্রহ করার জন্য টঙ্গীর হাটে এসেছি। এখান থেকে হাঁস কিনে নিয়ে টঙ্গী ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করি। মূলত হাটে যে দামে হাঁস পাওয়া যায়, তার সঙ্গে কিছুটা লাভ রেখে মানুষের কাছে বিক্রি করি। প্রতিটি হাঁসে সাধারণত ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে।’

খাঁচার পাখি লাভবার্ড পালনের খুঁটিনাটি
টঙ্গী বাজারের এই সাপ্তাহিক হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়। এখানে ডানা ঝাপটানোর শব্দের সঙ্গে মিশে থাকে খামারির পরিশ্রম, বিক্রেতার জীবিকার স্বপ্ন, ক্রেতার প্রয়োজন আর গ্রামবাংলার এক টুকরো চেনা জীবন। রোববার এলেই সেই জীবন আবার জমে ওঠে খাঁচা, হাঁস, পাখি আর মানুষের কোলাহলে।
এসইউ
from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/NMQoSOf
via IFTTT

