দেশে বর্তমানে ১৩টি শ্রম আদালত এবং একটি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল থাকলেও শ্রম-সংক্রান্ত মামলার জট উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আইন অনুযায়ী, শ্রম আদালতে ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৪ বছর এবং আপিলে গেলে ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত সময় লাগছে। এই দীর্ঘসূত্রতা শ্রম আদালতের মূল উদ্দেশ্য, দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ব্যাহত করছে।
এমন পরিস্থিতিতে লেবার কোর্ট ল’ইয়ারস সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ এস এম আনিছুজ্জামান তুহিনের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক।
আরও পড়ুন
ঢাকার শ্রম আদালতে ঝুলছে সাড়ে ১০ হাজার মামলা
সরকারি আইনি সহায়তায় আস্থা কম, সেবাগ্রহীতা এক শতাংশেরও নিচে
শ্রমিক সুরক্ষায় আইন আছে, কিন্তু কতটা কার্যকর?
জাগো নিউজ: শ্রম আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রতার মূল কারণ কী?
আনিছুজ্জামান: শ্রম আদালতের মামলাগুলো দীর্ঘসূত্রতায় পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিচারিক সিদ্ধান্তের পরও উচ্চ আদালতে (হাইকোর্টে) পুনরায় চ্যালেঞ্জ হওয়া।
আইন অনুযায়ী শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল একটি চূড়ান্ত বিচারিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই রায়ও হাইকোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে একই মামলার বিচার একাধিক স্তরে ঘুরে আবার শুরু হয়, যা পুরো প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে তোলে। এতে শ্রমিকদের দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হচ্ছে এবং মামলার জট ক্রমাগত বাড়ছে।

জাগো নিউজ: শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত কার্যত কতটা কার্যকর?
আনিছুজ্জামান: আইন অনুযায়ী শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রায়কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরা হয় এবং সেখানেই মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
ট্রাইব্যুনালে একজন সাবেক বিচারপতি (এক্স-জাস্টিস) বিচারকার্য পরিচালনা করলেও সেই রায়ও হাইকোর্টে আপিলের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। ফলে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত কার্যত চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে না।
ফলে শ্রম আদালতের উদ্দেশ্য দ্রুত ও বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থা প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে এবং মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পেতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে।

জাগো নিউজ: বিচার কার্যক্রমে শ্রম আদালতের কাঠামোগত সমস্যা কী?
আনিছুজ্জামান: শ্রম আইন অনুযায়ী (বিশেষ করে ধারা ২১৩ ও ৩৩ অনুযায়ী) শ্রম আদালতের বিচারিক কাঠামোতে শুধু বিচারকই নন, মালিক পক্ষ এবং শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের উপস্থিতি ও মতামতের ভিত্তিতেই অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
কিন্তু বাস্তবে এই দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা নিয়মিত আদালতে উপস্থিত থাকেন না। তাদের অনুপস্থিতির কারণে একক বিচারকের ওপর পুরো দায়িত্ব পড়ে, যা আইনগতভাবে জটিল মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে বাধা সৃষ্টি করে।
ফলে বিচারককে বারবার তারিখ দিতে হয়, শুনানি স্থগিত রাখতে হয় এবং অনেক মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
বিশেষ করে কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রতিনিধি অনুপস্থিতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে মামলা নিষ্পত্তির গতি মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন
শ্রম আদালতে মামলার জট নিরসনে কর্মশালা
ঝুলে আছে ২৬ হাজার মামলা, হচ্ছে আরও ৭ শ্রম আদালত
ছয় কোটি শ্রমিকের জন্য ৭ আদালত
জাগো নিউজ: প্রতিনিধি অনুপস্থিতির প্রভাব কী?
আনিছুজ্জামান: মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি আদালতে নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় বিচার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। তাদের মতামত ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া আইনি কাঠামো অনুযায়ী কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে বিচারক একা সম্পূর্ণ তথ্য বিশ্লেষণ করে রায় দিতে না পারায় বারবার শুনানি পিছিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে মামলা নিষ্পত্তির গতি কমে যায় এবং বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
এটি শ্রম আদালতের অন্যতম বড় প্রশাসনিক দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
‘দেশের ৬ কোটি শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা ও মজুরির মানদণ্ড নেই’
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বড় অংশ নির্ভরশীল ‘শ্রম আইন বাস্তবায়নের ওপর’
শিল্পাঞ্চল খ্যাত নারায়ণগঞ্জে শ্রম আদালতের কার্যক্রম শুরু
জাগো নিউজ: মামলার নথিপত্র (ডকুমেন্টেশন) সমস্যার প্রভাব কী?
আনিছুজ্জামান: অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাসময়ে বা সঠিকভাবে আদালতে জমা দেয় না। শ্রমিকপক্ষের ক্ষেত্রেও অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ ও প্রমাণযোগ্য কাগজপত্র থাকে না।
ফলে আদালতকে বারবার অতিরিক্ত সময় দিতে হয় কাগজপত্র যাচাই, পুনরায় দাখিল বা শুনানি স্থগিতের জন্য। এতে মামলার গতি কমে যায় এবং বিচার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে।
যদি সবপক্ষ শুরুতেই সঠিক ডকুমেন্টেশন প্রদান করত, তাহলে অনেক মামলাই দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হতো বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

জাগো নিউজ: শ্রম আদালতে মামলার বর্তমান চাপ ও প্রবণতা কী?
আনিছুজ্জামান: বর্তমানে দেশে শ্রম আদালতগুলোতে মামলার চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৭ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে ঢাকা, গাজীপুর এবং চট্টগ্রাম এই তিন অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মামলা জমে আছে। শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থান বেশি থাকায় এসব এলাকায় শ্রম বিরোধও বেশি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আদালতের ওপর। ফলে, নতুন মামলা বাড়ার হার নিষ্পত্তির চেয়ে বেশি হওয়ায় সামগ্রিক জট আরও বাড়ছে।
জাগো নিউজ: কোন কোন আদালতে সবচেয়ে বেশি মামলার চাপ?
আনিছুজ্জামান: সবচেয়ে বেশি মামলার চাপ রয়েছে ঢাকার শ্রম আদালতগুলোতে। রাজধানীর তিনটি শ্রম আদালতেই অর্ধেকের বেশি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ঢাকার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রম আদালতে হাজার হাজার মামলা ঝুলে আছে, যার বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে অনিষ্পন্ন। বিশেষ করে দ্বিতীয় শ্রম আদালতে দীর্ঘদিন ধরে মামলার জট সবচেয়ে বেশি।
এর বাইরে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে শিল্পাঞ্চল ঘিরে মামলার চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতেও হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন। তুলনামূলকভাবে রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরে মামলা কম হলেও সারাদেশে সামগ্রিকভাবে নিষ্পত্তির গতি ধীর।
জাগো নিউজ: জাগো নিউজকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আনিছুজ্জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ। জাগো নিউজের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।
এমডিএএ/এমএমএআর/এমএফএ
from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/GMcAs48
via IFTTT