আগেকার রাজা-বাদশাহদের গল্প সব সময় আমাদের চমক দেয়। কয়েক দশক আগের জমিদারি গল্পই আমাদের যেখানে চমকে দেয় সেখানে রাজ-রাজাদের ব্যাপার সেপার তো আলাদাই ছিল। তাদের খাওয়া-পরা, পোশাক, গয়না, বিলাসিতা সব কিছুই আজকের যুগে অকল্পনীয় এবং কিছুটা ঈর্ষণীয় তো বটেই।
ঈর্ষণীয় এজন্যই বলছি, যে ধরুন সেসময়ের একজন রাজা যদি চাইতেন এখন বিরিয়ানি খাবেন, সঙ্গে সঙ্গেই বাবুর্চিরা তা প্রস্তুত করে দিতেন। আবার মনে করুন যদি চাইতেন রানিকে খুশি করতে একটি হীরার গয়না উপহার দেবেন সঙ্গে সঙ্গেই টা পারতেন। আবার ধরুন, যদি আপনার আমার মতো যদি চাইতেন আজ সারাদিন ঘুমাবেন, তাহলে তাকে না করার সাধ্য কার? তাহলে বলুন ঈর্ষণীয় কেন নয়!

আচ্ছা সে যাই হোক, রাজাদের ব্যাপার-স্যাপার তো রাজকীয় ছিল তা ইতিহাসে পড়েছেন কিংবা সিনেমা দেখেও খানিকটা ধারণা হয়তো পেয়েছেন। কিন্তু এই রাজকীয়তার একটি মজার গল্প শোনাব। শিরোনাম পড়ে কিছুটা আন্দাজ হয়তো করতে পেরেছেন যে কোনো খাবারের কথা বলছি। আসুন পুরো বিষয়টি খোলসা করা যাক-
কাবাব নিশ্চয়ই খেতে পছন্দ করেন। বাংলা ছাড়াও অনেক দেশের খাবারের তালিকায় খাবার জনপ্রিয় এক পদ। শুধু কাবাব নয়, মোগলাই নানান পদ বেশ জনপ্রিয় খাবার। এই খাবারের সঙ্গে কেউ খেতে পছন্দ করেন পরোটা, কেউ নানরুটি, কেউ রুমালি রুটি। এই রুমালি রুটি পাতলা, নরম, এতটাই মোলায়েম যে হাতে নিলে মনে হয় কাপড়ের টুকরো।
কাবাব, কোরমা কিংবা মাংসের ঝোল মোগলাই খাবারের সঙ্গে রুমালি রুটি না থাকলে অনেকেরই যেন ভোজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। রেস্তোরাঁয় অর্ডার করার সময়ও এর আলাদা কদর। কিন্তু এই রুটির নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। ‘রুমাল’ থেকেই এসেছে ‘রুমালি’ অর্থাৎ রুমালের মতো পাতলা রুটি। আর এর ইতিহাস ঘিরে রয়েছে মোগল দরবার, প্রাচীন ভারতীয় রুটির ঐতিহ্য এবং একাধিক বিতর্কিত কিংবদন্তি।

রুমালি রুটিকে ঘিরে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি বেশ চমকপ্রদ। বলা হয়, মোগল আমলে অত্যন্ত পাতলা এই রুটি সমৃদ্ধ, তেল-ঘিয়েভরা খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করা হতো এবং কখনো কখনো হাতের অতিরিক্ত তেল মোছার কাজেও ব্যবহার করা হতো। সেই কারণেই নাকি ‘রুমাল’-এর সঙ্গে এর নামের সম্পর্ক। এই ধারণাটি বিভিন্ন খাদ্যবিষয়ক লেখায় পাওয়া যায়। তবে বিষয়টি নিয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত। তাই রুমালি রুটি মোগলদের ‘টিস্যু পেপার’ ছিল এমন দাবি নিশ্চিত ইতিহাসের বদলে প্রচলিত খাদ্য-ইতিহাসের একটি আকর্ষণীয় ধারণা হিসেবেই দেখা বেশি নিরাপদ হবে।

শুধু মানুষ নয়, প্রাণীরাও পরকীয়ায় জড়ায়!
কিন্তু এর নামের মধ্যেই রয়েছে ইতিহাস। ‘রুমাল’ শব্দটি উত্তর ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ হাতের রুমাল। রুমালি রুটি সাধারণত এতটাই পাতলা ও নমনীয় হয় যে সেটিকে অনায়াসে রুমালের মতো ভাঁজ করা যায়। এই চেহারা থেকেই নামটির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। ভারতের উত্তরাঞ্চল, পাকিস্তানের পাঞ্জাব এবং মোগলাই ও আওধি খাবারের সঙ্গে এই রুটি দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত।
তবে রুমালি রুটির শিকড় শুধুই মোগল আমলে খুঁজলে ইতিহাসের একটা বড় অংশ বাদ পড়ে যেতে পারে। ‘মাণ্ডা’ বা ‘মণ্ডক’-এর সঙ্গে রুমালি রুটির সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও খাদ্য-ইতিহাসে আলোচনা রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় খাদ্যসংক্রান্ত সাহিত্যে ‘মণ্ডক’ নামে পাতলা গমের রুটির উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘ভোজনকুতূহল’-এর মতো প্রাচীন খাদ্যগ্রন্থে এমন একটি রুটির বর্ণনা রয়েছে, যা উল্টে রাখা পাত্রের ওপর তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। আজকের রুমালি রুটিও উল্টে রাখা তাওয়া বা কড়াইয়ের পিঠে তৈরি করা হয়। এই মিল থেকেই অনেকে মনে করেন, রুমালি রুটির ঐতিহ্য মোগলদেরও আগের হতে পারে।

তাহলে মোগলদের সঙ্গে সম্পর্কটা কোথায়? মোগল সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের খাদ্যসংস্কৃতির সম্পর্ক গভীর। রাজদরবারের রান্নাঘরে মধ্য এশিয়া, পারস্য এবং ভারতীয় রান্নার নানা উপাদান ও কৌশলের মেলবন্ধন ঘটেছিল। রুটি ও মাংসের নানা পদও সেই খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। রুমালি রুটি এই মোগলাই খাবারের পরম্পরার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে জনপ্রিয়তা পায় বলে বিভিন্ন খাদ্য-ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।
তবে এটিকে শুধু ‘মোগলদের আবিষ্কার’ বলা ঠিক হবে না। বরং পাতলা রুটির প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য, উত্তর-পশ্চিম ভারত ও পাঞ্জানের খাদ্যসংস্কৃতি এবং মোগল দরবারের রান্নার প্রভাব, এই সব মিলিয়েই এর বর্তমান রূপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হয়।
রুমালি রুটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এর তৈরির পদ্ধতি। ময়দা বা আটা দিয়ে তৈরি নরম ডোকে খুব পাতলা করে টেনে বা ছড়িয়ে দিতে হয়। দক্ষ রাঁধুনিরা অনেক সময় হাতের তালুতে বা বাতাসে ঘুরিয়ে সেটিকে প্রায় স্বচ্ছ করে ফেলেন। এরপর সাধারণ তাওয়ার বদলে উল্টে রাখা কড়াই বা তাওয়ার উত্তপ্ত পিঠে অল্প সময়ের জন্য সেঁকে নেওয়া হয়। ফলে রুটি হয় নরম, নমনীয় এবং ভাঁজ করার মতো পাতলা।

মোগল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিল্লির পাশাপাশি লখনৌ, হায়দরাবাদসহ নানা শহর হয়ে মোগলাই খাদ্যসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে। রুমালি রুটিও সেই যাত্রার অংশ হয়ে ওঠে। পরে ধাবা, কাবাবের দোকান, বিয়ের অনুষ্ঠান এবং রেস্তোরাঁয় এটি জায়গা করে নেয়। দিল্লির বিখ্যাত করিমস-এর ইতিহাসেও রুমালি রুটির সঙ্গে মোগলাই খাবার পরিবেশনের যোগ পাওয়া যায়; ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রেস্তোরাঁটি সাধারণ মানুষের কাছে মোগল ঘরানার খাবার পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম উদাহরণ।
আজ তাই রুমালি রুটি শুধু কোনো রাজদরবারের স্মৃতি নয়। কাবাবের পাশে ভাঁজ করা সেই পাতলা রুটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার রেস্তোরাঁ সংস্কৃতির পরিচিত মুখ। আর ‘টিস্যু পেপার’ হিসেবে ব্যবহারের গল্পটি সত্য হোক বা অতিরঞ্জিত কিংবদন্তি রুমালি রুটির নামের সঙ্গে রুমালের মিল এবং তার অস্বাভাবিক পাতলাভাবই তাকে অন্য সব রুটি থেকে আলাদা করে দিয়েছে। ইতিহাসের পথ পেরিয়ে একসময়কার সাধারণ রুটি কীভাবে আজকের ভোজনরসিকের পাতে অপরিহার্য হয়ে উঠলো, রুমালি রুটি তারই এক সুস্বাদু ও চমৎকার উদাহরণ।
সূত্র: টাইমস ইন্ডিয়া ফুড, মাফিনা
কেএসকে
from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/SMk2tFr
via IFTTT

