ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নেওয়া হয় ‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্প। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, তবে বাস্তবায়নে গতি নেই বললেই চলে। প্রকল্পটি নিয়ে ঠিকমতো সমীক্ষা রিপোর্ট করা হয়নি। মাটির নিচে পরীক্ষা করা হয়নি ঠিকমতো। এমনকি মাটির নিচে কী ধরনের ইউটিলিটি লাইন আছে তাও খতিয়ে দেখা হয়নি।
প্রকল্পটি যে পথে বাস্তবায়ন হবে সেই পথে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে গ্যাস-বিদ্যুৎ-টেলিফোনসহ নানা ইউটিলিটির লাইন। যে কারণে প্রকল্প মেয়াদের প্রায় ৮৯ শতাংশ শেষ হলেও ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২১ শতাংশ।
প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে, মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। প্রকল্পের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে মূল সড়কের অগ্রগতি ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, সার্ভিস লেনের ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সেতুর ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং কালভার্টের ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ কাজ হয়েছে।
‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের ধীরগতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯ দশমিক ৩২৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণ, সার্ভিস লেন নির্মাণ, সেতু, কালভার্ট ও ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কাঠামো বা স্ট্রাকচারাল অংশ
মহাসড়কের অন্যান্য অংশের তুলনায় সেতু ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং কালভার্ট ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ নির্মাণের গতি কিছুটা দৃশ্যমান, কারণ এই নির্দিষ্ট সাইটগুলো আগেই আংশিক অবমুক্ত ছিল। তবে ওভারপাস-ফ্লাইওভারের অগ্রগতি মাত্র ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং সড়ক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন- ইউটার্ন, রাউন্ড অ্যাবাউট ও ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কাজ এখনো শুরুই হয়নি। মাটির নিচে গ্যাসলাইন ও বৈদ্যুতিক তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার কারণে পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ওভারপাস, ফুটওভারব্রিজ, কালভার্ট, ফ্লাইওভারের পাইলিং কাজ।
‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের’ সার্বিক ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মেগা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন চিত্র অত্যন্ত মন্থর এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। জানুয়ারি ২০২১ থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল মেয়াদকাল ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও, এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। আইএমইডি প্রতিবেদনের বিষয়ে সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. মনিরুজ্জমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকা-সিলেট সড়কের ২০০ কিলোমিটারের বেশি সড়কে চার লেনের কাজ হচ্ছে। যখন প্রকল্পটি নেওয়া হয় তখন কিছু কিছু জায়গায় স্যাম্পলিং করে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) তৈরি করা হয়। ২০০ কিলোমিটার জুড়ে তো আর সার্ভে করা সম্ভব হয় না। সেই কারণে অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে কিছু জায়গা সমস্যা হচ্ছে।’
আইএমইডি’র সুপারিশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদার কাজ করে যাচ্ছে। তবে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আগে সমন্বয় করলে ভালো হতো। তাহলে কাজ আরও দ্রুত হতো। তবে আমরা সড়কের কাজ এগিয়ে নিতে সব ধরনে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’
ইউটিলিটি স্থানান্তর জটিলতায় ঢাকা-সিলেট চার লেন
প্রকল্পের ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাইপলাইন) স্থানান্তর সংক্রান্ত বিদ্যমান স্থবিরতা ও জটিলতায় প্রকল্পের কাজ। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), তিতাস গ্যাস ও জালালাবাদ গ্যাস সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন জরুরি। প্রতিটি সংস্থায় এই প্রকল্পের জন্য একজন করে ফোকাল পারসন নিয়োজিত না করলে প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা দেখা দেবে। সাধারণত গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রাক্কলন প্রণয়ন, বিল পরিশোধ, সড়ক খনন অনুমতি এবং মাঠপর্যায়ের কারিগরি সমন্বয়ের অভাবে প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি সংস্থায় একজন সুনির্দিষ্ট ফোকাল পারসন থাকলে নিজ নিজ দপ্তরের ফাইল অনুমোদন দ্রুত করা, নকশা ও রুট সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা সহজ হবে। এছাড়া শাটডাউন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে এককভাবে ভূমিকা রাখতে পারবেন। ইন-ডেপথ মনিটরিং প্রতিবেদনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অংশে এই সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এবং ইউটিলিটি সংস্থাসমূহের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা দূর হবে এবং একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক কাজের পরিবেশ তৈরি হবে, যা মূল মহাসড়ক নির্মাণ কাজকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে গতিশীল করবে।
ইউটিলিটি শিফটিং কাজের অগ্রগতি
আইএমইডি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদ্যুৎ সংক্রান্ত ইউটিলিটি (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও পিডিবি) স্থানান্তরের কাজ গড়ে প্রায় ৪৬ শতাংশ সম্পন্ন হলেও গ্যাস পাইপলাইন স্থানান্তরের ক্ষেত্রটি (বিশেষ করে তিতাস গ্যাস) পিছিয়ে রয়েছে। তিতাস গ্যাসের এই ০ দশমিক ৭৮ শতাংশের মতো স্থবির অগ্রগতি এবং জালালাবাদ গ্যাসের ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ মন্থর গতি সামগ্রিক মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে ফেলছে। মূল সড়কের নির্মাণকাজকে বাধাহীন করতে এই গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনসমূহ দ্রুত স্থানান্তরের লক্ষ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং কঠোর তদারকি জোরদার করা আবশ্যক।
শাটডাউন অনুমোদনে বিলম্ব: সচল বিদ্যুৎলাইনে কাজ করার জন্য জরুরি শাটডাউন প্রয়োজন হয়, কিন্তু উচ্চতর কর্তৃপক্ষ থেকে সময়মতো শাটডাউন অনুমোদন পেতে দেরি হওয়ায় মাঠপর্যায়ের কাজের গতি কমে যায়। প্রকল্প এলাকায় শিল্পাঞ্চল হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে লাইন কাট করে কাজ করার অনুমোদন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে, গ্যাস ও বিদ্যুৎলাইন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বিন্যস্ত থাকায় একটির অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত অন্যটির কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। পল্লী বিদ্যুতের ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদাররা তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় তাদের পর্যাপ্ত উপকরণের অভাব রয়েছে। লাইন স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে।
উপকরণের অপ্রতুলতা: সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার বা অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
গলার কাটা বিদ্যুতের খুঁটি-গ্যাসলাইন
বিদ্যুৎ লাইনের খুঁটি স্থানান্তরের জন্য অনেক স্থানে প্রয়োজনীয় সাইট এখনো প্রস্তুত নয়, বিশেষ করে নিচু জমি ও জলাবদ্ধ এলাকায় পর্যাপ্ত মাটি ভরাট না হওয়ায় নিরাপদভাবে খুঁটি স্থাপন করা যাচ্ছে না। সচল লাইনে কাজ করার সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো অতিরিক্ত সময় ও সতর্কতার দাবি রাখে, যা কাজের গতিকে ধীর করে দেয় বলে জানায় আইএমইডি। ফিজিবিলিটি সমীক্ষার দীর্ঘসময় পর মূল কাজ শুরু হওয়ায় মাঠের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে নকশার মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
বিদ্যমান অবকাঠামোর পরিবর্তনের কারণে বারবার নকশা পরিবর্তন, অ্যালাইনমেন্ট সংশোধন এবং অতিরিক্ত কাঠামো সংযোজন করতে হচ্ছে, যা প্রকল্পের সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি করছে। সাব-স্টেশন, বিভিন্ন ইউনিট এবং ঠিকাদারদের মধ্যে কাজের সময়সূচি সমন্বয় করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, ফলে একই এলাকায় একাধিক কাজ একসঙ্গে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায় থেকে রক্ষণাবেক্ষণ বা দূত কারিগরি সহায়তা পাওয়া যায় না, যা মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে বিলম্বিত করে।
গ্যাসলাইন স্থানান্তরের চ্যালেঞ্জ ও আইনি জটিলতা
শিল্পাঞ্চল হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে গ্যাসলাইন কাট করে কাজ করার প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। গ্যাসের লাইনে আংশিক ক্লিয়ারেন্স নিয়ে কাজ করার সুযোগ কম থাকে। পুরো লাইনটি শতভাগ ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত কাজ শুরু করা সম্ভব হয় না। এটা অনেক সময়সাপেক্ষে হয় বলে জানায় আইএমইডি। প্রকল্পের ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাইপলাইন) স্থানান্তর সংক্রান্ত বিদ্যমান স্থবিরতা ও জটিলতা নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে জটিলতায় পড়বে ঢাকা-সিলেট চার লেন নির্মাণকাজ।
আইএমইডি জানায়, প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা ও নিবিড় সমীক্ষায় বেশকিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি দুর্বলতা রয়েছে, যা কাজের স্বাভাবিক গতিকে মন্থর করছে। প্রকল্পটির গোড়াতেই একটি বড় কারিগরি ত্রুটি ছিল। প্রায় ৭ বছর আগে সম্পাদিত প্রাথমিক সমীক্ষায় মাটির নিচের স্তরের (সাব-সয়েল) বৈশিষ্ট্যসমূহ পূর্ণাঙ্গ ও সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। এর ফলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে ক্ষতিকর কাদা এবং ভারবহনে অনুপযুক্ত মাটির উপস্থিতি মেলায় মূল ডিজাইন সংশোধন করতে হয়েছে, যা বাড়তি সময় ও শ্রমের অপচয় ঘটিয়েছে।
জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরের জটিলতা এই প্রকল্পের অন্যতম বড় দুর্বলতা। প্রকল্প মেয়াদের ৮৯ শতাংশ সময় পার হয়ে গেলেও ভূমি অবমুক্তকরণের অগ্রগতি মাত্র ৩৭ দশমিক ৬১ শতাংশ, বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তরে ৪৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং তিতাস ও জালালাবাদ গ্যাসের লাইন স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অগ্রগতি যথাক্রমে মাত্র ০ দশমিক ৭৮ শতাংশ ও ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ; যা সামগ্রিক কাজের ক্ষেত্রে একটি চরম স্থবিরতা তৈরি করেছে।
আইএমইডি আরও জানায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) গাইডলাইন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে গিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বিলম্ব ঘটেছে, যেখানে চুক্তি সম্পাদনেই লটভেদে ১১ থেকে ১৯ মাসের মতো দীর্ঘ প্রশাসনিক সময়ক্ষেপণ হয়েছে। মাঠপর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), জেলা প্রশাসন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে।
মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার পেছনে কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তারল্য সংকট এবং দুর্বল সাইট ম্যানেজমেন্ট বা তদারকি ব্যবস্থার অভাব দায়ী। বিভিন্ন অংশীজন সংস্থার মধ্যে দাপ্তরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের ঘাটতির কারণে প্রকল্পের মোট ১৯টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১৫টিই এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়ে গেছে, যা সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
ঝুঁকিতে ঢাকা-সিলেট চার লেন
প্রকল্পের বাহ্যিক পরিবেশ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকিসমূহ পর্যালোচনা করে বেশকিছু বড় চ্যালেঞ্জ ও হুমকি দেখা গেছে, যা প্রকল্পের গতিশীলতা ও সফল সমাপ্তিকে ব্যাহত করতে পারে। প্রথমত, প্রকল্পের কারিগরি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিলম্বের ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে নতুন কারিগরি নকশা সংশোধন, অনুমোদন এবং বিশেষজ্ঞ সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মাঠপর্যায়ের কাজ আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের ক্রমাগত তারতম্যের ফলে প্রাক্কলিত প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নির্মাণ সামগ্রীর বাজারমূল্য অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়ে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, সঠিক সময়ে মানসম্মত নির্মাণ সামগ্রীর সম্ভাব্য ঘাটতি এবং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম আর্থিক দীনতার কারণে সামগ্রিক প্রকল্পের গতি মারাত্মকভাবে থমকে যাওয়ার ঝুঁকি বিদ্যমান।
চতুর্থত, মহাসড়কটিতে তীব্র চলমান যানবাহনের (রানিং ট্রাফিক) মাঝে কাজ করতে হচ্ছে, যেখানে পর্যাপ্ত সেফটি ব্যারিয়ার বা দিকনির্দেশক সাইনেজের অভাব এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে মাঠপর্যায়ের শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীদের জন্য প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও যানজটের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। পঞ্চমত, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আবহাওয়ার আকস্মিক আচরণ প্রকল্পের ভৌত কাঠামোর জন্য বড় হুমকি, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় হাইওয়ের নতুন মাটির কাজ ও সাবগ্রেড ধসে গিয়ে ভৌত অবকাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতির চরম ঝুঁকি রয়েছে।
সর্বোপরি, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর এবং অন্যান্য অনিবার্য কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বা বিলম্ব হলে নির্মাণ সামগ্রীর বাজারমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকল্পের সামগ্রিক পরিচালন ব্যয়ও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের মূল প্রাক্কলিত বাজেটকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শাখায় জনবল সংকট, কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ এবং ক্ষতিপূরণ নিয়ে আপত্তির কারণে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বারবার বিলম্বিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন ও মামলা-মোকদ্দমার কারণে চূড়ান্ত জমি হস্তান্তর দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা ঠিকাদারদের কাজ শুরু বা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে কিছু লটে পর্যাপ্ত সাইট হস্তান্তর হওয়া সত্ত্বেও কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এর পেছনে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি, সাইট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং কার্যকর পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মহাসড়কটিকে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ করিডোরে রূপান্তরের লক্ষ্যে নতুন করে ব্যাপক ‘সেফটি ইন্টারভেনশন’ যুক্ত করায়ও নির্মাণকাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে সমীক্ষায় বলা হয়েছে। প্রাথমিক নকশায় বাদ পড়া ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস পুনরায় সংযোজনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বর্তমানে ৯টি ফ্লাইওভার, ৪২টি লাইট ভেহিকুলার আন্ডারপাস, ২২টি ভেহিকুলার আন্ডারপাস এবং ৭৭টি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা যুক্ত হয়েছে।
ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের ১৩টি লটের দরপত্র প্রক্রিয়া বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দরপত্র আহ্বান থেকে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত প্রতিটি লটেই অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় লেগেছে ১১ থেকে ১৯ মাস। সমীক্ষা অনুযায়ী, কারিগরি দরপত্র মূল্যায়ন বা টেকনিক্যাল বিড ইভালুয়েশন রিপোর্ট (টিবিইআর) অনুমোদনে ২১ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১১৩ দিন এবং আর্থিক মূল্যায়ন বা ফিন্যান্সিয়াল বিড ইভালুয়েশন রিপোর্ট (এফবিইআর) অনুমোদনে ১০ দিন থেকে ৭৬ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে। ফলে শুধু এই দুই ধাপেই কিছু লটে তিন থেকে সাড়ে ছয় মাস পর্যন্ত সময় অতিবাহিত হয়েছে। এই বিলম্বের কারণে দরপত্রের বৈধতার মেয়াদও একাধিকবার বাড়াতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিড ভ্যালিডিটি ২৪০ থেকে ৩৪৫ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপ্রস্তাবের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিকূল আবহাওয়া-যানজট ‘বড় বাধা’
প্রতিকূল আবহাওয়া ও তীব্র যানজটও প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমইডি। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হয়। একই সঙ্গে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়কে যানজটের কারণে নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সঙ্গে বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির অসামঞ্জস্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেছে। মাঠপর্যায়ে নতুন করে উদ্ভূত কারিগরি সমস্যার সমাধানে অতিরিক্ত সমীক্ষা ও নকশা সংশোধন করতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক বাস্তবায়ন সময় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে এবং এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফলও বিলম্বিত হবে। আইএমইডি’র সব সুপারিশ মেনে নিয়ে সেই আলোকে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সওজ এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. মনিরুজ্জমান।
এমওএস/ইএ
from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/tSmCqFB
via IFTTT







