চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন বাসিন্দারা

চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধের সংস্কারকাজ ধীরগতিতে চলায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কাজের অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে। তবে তারা এরইমধ্যে সুফল পেতে শুরু করেছেন বলে স্বীকার করেছেন।

প্রমত্তা মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন থেকে চাঁদপুর শহরকে রক্ষায় ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে শহররক্ষা বাঁধের সংস্কারকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় মাদরাসা রোড লঞ্চঘাট থেকে পুরানবাজার রনগোয়াল পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ২২ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ সংস্কার করা হচ্ছে। ভাঙন প্রতিরোধে নদীতে ফেলা হচ্ছে বালিভর্তি জিও ব্যাগ এবং পাথরের তৈরি কংক্রিট ব্লক।

আরও পড়ুন

সিরাজগঞ্জে যমুনার তীররক্ষা বাঁধে ধস, আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দারা

চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮১৫ কোটি টাকা। ১৯টি প্যাকেজে কাজ করছে ৯টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে প্রকল্পের তিন বছর অতিক্রম হলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শহররক্ষা বাঁধের পুরানবাজার অংশের অন্তত এক হাজার মিটার এলাকা মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনের শিকার হয়। এতে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় শতাধিক বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অনেক পরিবার তাদের বসতভিটা ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারায়।

চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন বাসিন্দারা

স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের সংস্কারকাজ শুরুর পর থেকে আমাদের এলাকায় নদীভাঙন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আগে বর্ষা মৌসুম এলেই নদীপাড়ের মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাত। নদীর ভয়াবহ ভাঙনে অনেক পরিবার তাদের বসতভিটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা হারিয়েছে। তবে বর্তমানে সংস্কারকাজ চলমান থাকায় নদীভাঙন কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করেছে। এখন আমাদের একটাই প্রত্যাশা, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর নদীভাঙনের ভয় নিয়ে বসবাস করতে না হয়।

স্থানীয় জেলে হুমায়ুন বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা নদীপাড়ে বসবাস করছি। জীবনে কতবার যে নদীভাঙনের শিকার হয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই। নদী আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। বছরের পর বছর আমরা একটি স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়ে এসেছি। অনেক দিন পর সরকার নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে, যা আমাদের জন্য আশার খবর। আমরা চাই শুধু পুরানবাজার নয়, পুরো ঝুঁকিপূর্ণ তীরজুড়ে শক্তিশালী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে নদীভাঙনের কারণে ঘরবাড়ি হারাতে না হয়।

আরও পড়ুন

২০২৬-২৭ অর্থবছরে নির্মাণ হবে ৩০৯ কিলোমিটার বাঁধ

ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনের কারণে নদীপাড়ের ব্যবসায়ীরা সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। বিশেষ করে তিন নদীর মোহনায় বর্ষা মৌসুমে তীব্র স্রোত সৃষ্টি হয়। এসময় মালবাহী ট্রলার, কার্গো ও অন্যান্য নৌযান চলাচলে ব্যাপক ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় পণ্যবাহী ট্রলার ডুবে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। আমরা আশা করছি টেকসই ও মানসম্মত বাঁধ নির্মাণ হলে নদীর তীর সংরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি স্রোতের তীব্রতাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। এতে নৌযান চলাচল নিরাপদ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, নদীপাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধটি দ্রুত এবং টেকসইভাবে সংস্কার করা না হলে পুরানবাজারসহ আশপাশের ব্যবসায়িক এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে বাঁধের দুর্বল অবস্থার কারণে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন, নৌযান থেকে মালামাল ওঠানো-নামানো এবং সার্বিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে যেমন ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ের অপচয় হচ্ছে, তেমনি ব্যবসার স্বাভাবিক গতিও ব্যাহত হচ্ছে।

চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন বাসিন্দারা

তিনি আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কারণে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে কিংবা নদীর পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই শুধু সাময়িক মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদীপাড়ের বাঁধ নির্মাণ এবং নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা গেলে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী পুরানবাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি ফিরে আসবে। ব্যবসায়ীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে, পণ্য পরিবহন আরও সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে। একইসঙ্গে পুরানবাজার তার ঐতিহ্য ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব পুনরুদ্ধার করে আবারও জেলার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

আরও পড়ুন

দৃশ্যমান ‘বামনী ক্লোজার’, উপকৃত হবেন ৯ লাখ মানুষ

চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম জানান, সংস্কারকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে কিছুটা ধীরগতির হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালে শুরু হওয়া চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের এই সংস্কার প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জুন মাসে। কাজের গতি আরও বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে টেকসই এই বাঁধ ভবিষ্যতে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙন থেকে চাঁদপুর শহর, নদীপাড়ের জনপদ এবং পুরানবাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দেবে।

এফএ/এএসএম



from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/JDvqb7e
via IFTTT
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post