রক্তদান একটি মহৎ কাজ। রক্তের অভাবে যখন কেউ বেঁচে থাকার আকুলতা নিয়ে কাতরাতে থাকে তখন ত্রাতা হয়ে আসে একঝাঁক স্বেচ্ছাসেবী রক্তযোদ্ধা। যারা নিজেদের সখ-আল্লাদ বিসর্জন দিয়ে দিন কিংবা গভীর রাত যে কোনো সময় প্রস্তুত থাকেন রক্ত দানের মহৎ কাজে নিজেকে সপে দিতে। স্বেচ্ছায় রক্তদান করে যারা শত সহস্র প্রাণে হাসি ফুটিয়েছেন। আড়াল থেকে বিপন্ন প্রাণে আশা জাগিয়েছেন এবং রক্তদানে নানা কুসংস্কার ও ভয় পরাভূত করে রক্তদানে উৎসাহিত করাই এ দিবসের উদ্দেশ্য। প্রতি বছর ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস পালন করা হয়।
আজ বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর ভাবনা লেখায় ফুটিতে তুলেছেন আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল-
লাল ভালোবাসায় মানবিক সংস্কৃতির সূত্রপাত
সাইফুল্লাহ বিন মানসুর
নিয়মিত রক্তদাতা ও সভাপতি, নব দিগন্ত ব্লাড গ্রুপ, মধুপুর
বাংলাদেশের মাটি ও প্রকৃতির পরশে তরুণরা হয়ে উঠছে ব্যতিক্রমী উদাহরণ। শুধু বসন্তের পাপড়ী, ঘ্রাণে বা প্রেয়সীর নয়নে সীমাবদ্ধ নেই বাংলাদেশের তরুণদের ভালোবাসা। বরং রক্তদানের নাম রেখা হয়েছে ‘লাল ভালোবাসা’। বাংলাদেশের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে সেচ্ছাসেবী তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তারা রক্তের ডাকে সারা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ যেনো সত্যিই এক চমৎকার মানবিক সংস্কৃতি। এক সময় রক্তের অভাবে মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। এখন অনেকাংশেই কমে এসেছে। যার অধিকাংশ কৃতিত্বই তরুণ ছাত্রছাত্রীদের।

তরুণদের রক্তদান যেসব কারণে ভীষণ জরুরি
তবে রক্তদানে যেমন রয়েছে সুখকর স্মৃতি তেমনি রয়েছে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা। একজন রক্তদাতা কৃতজ্ঞতা ছাড়া কিছু প্রত্যশা করে না। আর সুন্দর ব্যাবহারের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেতে পারে কৃতজ্ঞতার স্বরুপ। আমরা যদি এই মহৎ কাজের মূল্যায়ন করতে না পারি তাহলে মাশুল দিতে হবে আগামীর প্রজন্মকে। এক সময় রক্তদানে ছিল নানা কুসংস্কার ও আতঙ্ক। আশার কথা, মানুষ দিন দিন সচেতন হচ্ছে। ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন রক্তদাতা সংগঠনের ব্যানারে ফ্রী ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্পেইন, সচেতনতা মূলক ক্যাম্পেইনসহ রক্তদানে উৎসাহিত করতে অনবদ্য ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে প্রসূতি, থ্যালাসেমিয়া ও অস্ত্রপাচারে রক্তের সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নিরাপদ ও পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সেচ্ছায় রক্তদান আরও বৃদ্ধি করা দরকার।
সে অনূভুতি ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ
আরশেদ আলম
নিয়মিত রক্তদাতা ও সাধারণ সম্পাদক, হৃদয়ে মধুপুর ব্লাড সোসাইটি
রক্তদানের অনুভূতি এমন যে সেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমার রক্তে যদি কোনো বিপন্ন প্রাণে আশার সঞ্চার হয় তাহলে সেটা কতটা প্রশান্তি ও মানসিক শান্তি দেয় সেটা কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনাহীন। আমি নিজেও ২২ ব্যাগ রক্ত দিয়েছি। রক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। যা রোগীর চিকিৎসা, দুর্ঘটনা কিংবা অস্ত্রোপচারে রোগীর জীবন বাঁচাতে অধিকাংশ সময় প্রয়োজন হয়। সমাজে সচেতনতার অভাবে অনেকেই রক্তদানের মতো মহৎ কাজ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করছে। অথচ সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে আমরা প্রতি ১২০ দিন পরপর রক্ত দিতে পারি। নির্দিষ্ট সময়ে রক্তকণিকা ভেঙে যায় যা আমাদের শরীরে কোনো কাজে আসে না অথচ এই রক্ত অন্যকে দিলে তার জন্য তা হতে পারে অন্যন্য। সাম্প্রতিক সময়ে চাইলে রক্ত পাওয়া যায় বিভিন্ন সংগঠন থেকে। ব্লাড ব্যাংকে সংরক্ষিত রক্ত ও স্বেচ্ছাসেবকদের স্বেচ্ছায় প্রদানকৃত রক্তে নতুন জীবনে প্রাণের স্পন্দন পাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। সংগঠক হিসেবে নিজের ব্যস্ততা কাটিয়ে তরুণ প্রজন্মের হাতে রক্তদানের মতো মহত্ব কাজ তুলে দিতে এগিয়ে চলছি দৃঢ় প্রত্যয়ে। যুব সমাজকে নিয়ে যখন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা চারপাশে তখন তরুণদের পাশে নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমার লক্ষ্য। বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে বিশ্বের সব রক্তযোদ্ধাদের জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।
রক্তদানে প্রযুক্তির ছোঁয়া
জসিম উদ্দিন
নিয়মিত রক্তদাতা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাঁধন, আনন্দ মোহন কলেজ ইউনিট
রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশে রক্তের অভাবে রোগী মারা যাবে এটা হতে পারে না। এমন চিন্তা থেকে কিছু সুনাগরিকের সুচিন্তার ফল হিসেবে দেশে একে একে গড়ে উঠেছে স্বেচ্ছায় রক্তদান সংগঠন। প্রতিটি সংগঠন তাদের নিজস্ব নীতিমালার আলোকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রযুক্তি নির্ভর যুগে তাদের কাজের পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংগঠনগুলো ডিজিটাল প্লাটফর্মে কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে। সংগঠনগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রক্তদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখছে ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ বা পেজে। সম্প্রতি বাঁধন সহজেই রক্তদাতা খোঁজে পেতে চালু করেছে ‘বাঁধন এপস’।
বর্তমানে অনলাইন ভিত্তিক অসংখ্য রক্তদান সংগঠন গড়ে উঠেছে। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে রক্তদাতা খুঁজে পেতে অনেক সহজ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রক্তদাতা সংগ্রহে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতারক চক্র অনলাইনে রক্তগ্রহীতার সঙ্গে প্রতারণা করছে। এটি প্রায়ই রোগীকে আরও বেশি সংকটে ফেলে দিচ্ছে। অনলাইনে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় এদের প্রতিহত করাও কঠিন। এতে অনেক সময় সংগঠনের সুনাম নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। কাজেই রক্তদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহারের বিষয়ে রক্তদাতা, রক্তগ্রহীতা, বিভিন্ন সংগঠন এবং সব নাগরিকদের আরও সতর্ক হতে হবে।
রক্তদান নয় শুধু দান, এটি জীবনের প্রতি সম্মান
এস.এম.মেহেদী হাসান সোহাগ
সাধারণ সম্পাদক, বাঁধন আনন্দমোহন কলেজ ইউনিট, বিভাগীয় জোন-১
একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন। স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের শরীরের রক্ত অন্য কোনো মুমূর্ষু রোগীর প্রয়োজনে দান করাই হলো স্বেচ্ছায় রক্তদান। স্বেচ্ছায় রক্তদান একটি মহৎ ও মানবিক কাজ। আমাদের সমাজে এমন অনেক রোগী আছে, যারা থ্যালাসেমিয়া এবং এপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত। এই সব রোগীদের ক্ষেত্রে তাদের দেহে নতুন করে কোনো রক্তকণিকা উৎপন্ন হয় না। ফলে তাদের দেহে রক্ত কণিকার ঘাটতি দেখা দেয়। আমাদের মতো সুস্থ দেহ থেকে রক্ত নেওয়ার মাধ্যমেই তারা বেঁচে থাকে। তাছাড়া বর্তমানে অনেকের মধ্যে রক্তস্বল্পতা রোগের হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়াও আকস্মিক দূর্ঘটনায় কবলিত হয়ে অনেক মুমূর্ষু ব্যক্তির রক্তের প্রয়োজন হয়। এজন্য বর্তমান সময়ে রক্তের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বেচ্ছায় রক্তদানে কোনো ক্ষতি হয় না। প্রতি চার মাস অন্তর অন্তর রক্তদান করলে শরীরে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমে, হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়, ক্যানসারের ঝুঁকি কমে এবং মেডিকেলে বিনামূল্যে পাঁচটি রক্তের পরীক্ষা (ম্যালেরিয়া, এইডস, হেপাটাইটিস) করা যায়। এজন্য আমরা চেষ্টা করছি সবাইকে সচেতন করা এবং রক্তদান কে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। আমরা স্বপ্ন দেখি সেই দিনের, যেদিন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ নিজেদের রক্তের গ্রুপ জানবে এবং মুমূর্ষ রোগীদের সহায়তায় স্বেচ্ছায় রক্তদানে সচেতন হবে।
কেএসকে
from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/LV2oFPk
via IFTTT
