বিশ্বজুড়ে ব্রাজিলকে চেনা হয় ফুটবল, সাম্বা আর রঙিন কার্নিভালের দেশ হিসেবে। পাঁচবারের বিশ্বকাপজয়ী এই দেশের মানুষ যেমন মাঠে আবেগে ভাসে, তেমনি খাবারের টেবিলেও তারা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সমান গুরুত্ব দেয়। আর সেই ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হলো ‘ফিজোয়াদা’ একটি খাবার, যা ব্রাজিলিয়ানদের কাছে শুধুই রান্না নয়, বরং পারিবারিক মিলনমেলা ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।
ব্রাজিলে শনিবার দুপুরের সঙ্গে ফিজোয়াদার সম্পর্ক এতটাই গভীর যে অনেকেই দিনটিকে মজা করে ‘ফিজোয়াদা ডে’ বলে থাকেন। সপ্তাহজুড়ে কাজের ব্যস্ততা শেষে পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য শনিবারকে বিশেষভাবে বেছে নেয় ব্রাজিলিয়ানরা। আর সেই আড্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ধোঁয়া ওঠা এক পাত্র ফিজোয়াদা।

ফিজোয়াদা মূলত ব্রাজিলের একটি জনপ্রিয় খাবার। ফিজোয়াদার মূল উপাদান হলো কালো শিম। এর সঙ্গে যোগ করা হয় বিভিন্ন ধরনের মাংস, বিশেষ করে শুকরের মাংস, গরুর মাংস এবং চোরিজো সসেজ। পেঁয়াজ, রসুন, তেজপাতা ও গোলমরিচের মতো উপকরণ খাবারটিকে দেয় আলাদা সুবাস ও স্বাদ। দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে রান্না করার কারণেই এই খাবারের আসল জাদু তৈরি হয়।
ফিজোয়াদা তৈরির প্রক্রিয়া বেশ সময়সাপেক্ষ। সাধারণত বড় পাত্রে কালো শিম ও মাংস একসঙ্গে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধীর আঁচে সেদ্ধ করা হয়। এই দীর্ঘ রান্নার ফলে মাংসের স্বাদ, চর্বি এবং শিমের ঘনত্ব একত্রিত হয়ে তৈরি করে সমৃদ্ধ ও গভীর স্বাদের একটি স্টু। ব্রাজিলিয়ানরা মনে করেন, তাড়াহুড়ো করে রান্না করলে ফিজোয়াদার প্রকৃত স্বাদ পাওয়া সম্ভব নয়।
তবে শুধু ফিজোয়াদা পরিবেশন করলেই খাবারের আয়োজন সম্পূর্ণ হয় না। এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয় গরম সাদা ভাত, হালকা ভাজা কেল পাতা এবং ‘ফারোফা’। ফারোফা হলো কাসাভা থেকে তৈরি এক ধরনের সুস্বাদু গুঁড়া, যা খাবারে আলাদা টেক্সচার যোগ করে। পাশাপাশি কয়েক টুকরো তাজা কমলালেবু রাখাও প্রায় বাধ্যতামূলক। ভারী খাবার হওয়ায় কমলার টক-মিষ্টি স্বাদ হজমে সহায়ক বলে মনে করেন ব্রাজিলিয়ানরা।

ফিজোয়াদার জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু এর স্বাদ নয়, রয়েছে সামাজিক গুরুত্বও। শনিবার সকালে রান্না শুরু হওয়ার পর থেকেই বাড়িতে শুরু হয় গল্প, গান আর হাসি-আড্ডা। অনেক পরিবারে এটি এক ধরনের সাপ্তাহিক রীতি, যেখানে কয়েক প্রজন্ম একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করে সময় কাটায়। বন্ধুবান্ধবদের নিমন্ত্রণ করাও এই সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
খাওয়া শেষে অনেকেই উপভোগ করেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘কাইপিরিনহা’। লেবু, চিনি ও কাশাসা দিয়ে তৈরি এই পানীয় আড্ডাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ফলে ফিজোয়াদা শুধু একটি খাবার নয়, বরং পুরো দিনের একটি অভিজ্ঞতা।

ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানতে চাইলে ফুটবল ম্যাচ দেখা যেমন জরুরি, তেমনি এক শনিবার দুপুরে ফিজোয়াদার টেবিলে বসাও হতে পারে অনন্য অভিজ্ঞতা। কারণ এই খাবারের প্রতিটি চামচে মিশে আছে দেশটির ইতিহাস, পারিবারিক বন্ধন, বন্ধুত্ব এবং জীবনকে উদযাপন করার সহজাত আনন্দ।
সূত্র: কালচার ট্রিপ, বিবিসি, দ্য নট
কেএসকে
from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/7yHNLlE
via IFTTT

